মেনু নির্বাচন করুন
গল্প নয় সত্যি

আলোর সন্ধানে

          হরিরামপুরের সর্বদক্ষিনে আজাকারপাড়া গ্রামের পাশ দিয়ে চলে গেছে একচিলতে নদী। বর্ষাকালে হঠাৎ করে কোথা থেকে পানি এসে  চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আবার শুকনা মৌসুমে চারিদিকে বালি আর রৌদ্র খাঁ খাঁ করে এমনি একটি গ্রামে আমিন উদ্দিন পাইকার বয়স ৭০ এর কোঠায় চুল দাঁড়ি পেকে গিয়েছে। মুখ যতখানি শক্ত কিন্তু শরীরে ততখানি সবল নয়, শীর্ণকায় হয়ে কোন রকম চলাফেরা টুকু করতে পারে। মুখের চামড়া কুচকিয়ে গেছে, চোখে ভাল দেখতে না পেলেও চোখে তার এখন দীপ্ত চাহনি, কাউকে কাছে পেলে দেশের কত প্রশ্ন কিন্তু কেউ তার কথার উত্তর দেয় না। আজ বিকেল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। আমিন উদ্দিন একখানা ভাঁঙ্গা কাঠের চেয়ারে বাইরের বারান্দায় বসে আছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার, এখন বর্ষাকাল চারিদিকে পানি। গ্রামটি এতই অজপাড়া গাঁ যে, সন্ধ্যা হলে রাজ্যের অন্ধকার নেমে আসে, চারিদিকে কিছুই দেখা যায় না কোথায় যেন ঝি ঝি পোকা ডাকছে, উঠানে ব্যাঙের লাফালাফি। আজ আমিন উদ্দিনের এমনিতেই মনটা খারাপ, কি যেন আনমনা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করে বিদ্যুতের আলো জ্বলে উঠলো। সেইসাথে গ্রামটিও যেন আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল। বিদ্যুৎ লাইন পাবার বেশী দিন হয় নি। চারিপাশের গ্রামগুলিতে বিদ্যুৎ পৌঁছিলেও আজাকার পাড়ায় বিদ্যুৎ আসবে কিনা তারও কোন লক্ষন ছিল না। মাঝে মাঝে ঐ পাড়ার ওসমানের ছেলে মামুন এসে প্রত্যেকের কাছ থেকে দফায় দফায় টাকা তুলেছে, শুনেছি সে বিদ্যুতের অফিসে যাতায়াত করে তাকে টাকা দিলেই নাকি কাজ হয় কিন্তুও আমার কেমন জানি বিশ্বাস হয় না। কারণ এমন করে ঐ গ্রামের সোলেমানের পুত্র হালিম মুন্সী  মালয়েশিয়ায় যাওয়ার কথা বলে অনেকের নিকট লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে উধাও হয়েছে। তাই সবাই টাকা দিলেও আমি মামুনকে কোন টাকা দেই নাই। আর টাকা দেবই বা কোথা থেকে, সে নাকি ৭/৮ হাজার করে টাকা চায়, এত টাকা আমার নাই আর টাকাও দিতে পারব না। ঘরে এক ছেলে, দুই মেয়ে। তাদের বিয়ে সাদী হয়ে গেছে। ছেলের ঘরে পর পর ০৩টি মেয়ে, ছেলের আশায় আশায় ০৩টি মেয়ে হয়েছে। তারা সবাই নাকি গাজীপুরে গার্মেন্টেস এ চাকরী করে সেখানেই বিয়ে সাদী করেছে, তার সব ছোট ছেলেটি ব্রাকের স্কুলে পড়াশুনা করে, ওর দাদী আট দশ বছর আগে ক্যান্সারে মারা গেছে, ছেলে আকবর টুকিটাকি জমি চাষ করে আবার বর্ষাকালে দেশে কাজ না থাকলে সিলেটে গিয়ে কোথায় যেন মিস্ত্রিগিরি করে। মাঝে মাঝে বিকাশ করে টাকা পাঠায়, কোনমতে অভাবে সংসার চলে। আমি নিজে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম, কিন্তু কোন সার্টিফিকেট পাই নাই, তাই সরকারের কোন সাহায্য পাইনা। এমন সময় ৩/৪ মাসে আগে হঠাৎ করে এলাকায় মাইকিং হলো, সরকার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিবে, কোন টাকা লাগবে না। কাউকে কোন টাকা দিবেন না, শুনে অবাক হলাম। মাস খানেক আগে শুনলাম গ্রামে নাকি স্পট মিটারিং (Spot Metering)  হবে, সবাই এক সাথে কারেন্ট পাবে। সত্যি সত্যি গত শুক্রবার পল্লী বিদ্যুৎ থেকে গাড়ী ভর্তি করে মালামাল নিয়ে হাজির, অনেক লোক একসাথে সারাদিন কাজ করে ঐ দিনেই গ্রামের প্রায় ১০০ ঘরে মিটার দিয়ে বিদ্যুৎ দিল। হঠাৎ করে মনে হলো ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের মত দেশটা বোধ হয় আবারও স্বাধীন হলো। আজ ওর দাদী বেঁচে থাকলে কত খুশিই না হত। বাড়ীতে এখন কত আলো, চোখে আলো নাই তাই কি হয়েছে ? মনের ভেতর কেমন যেন আশার আলো দেখছি সত্যিই দেশটা বোধ হয় আলোর পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

ছবি/সংযুক্তি


ক্রম


Share with :

Facebook Twitter